ঢাকার ন্যায় চট্টগ্রামেও কাঁচা চামড়ার অস্বাভাবিক দর পতন

0
13
ঢাকার ন্যায় চট্টগ্রামেও কাঁচা চামড়ার অস্বাভাবিক দর পতন
ছবিঃ সংগৃহীত

খবর৭১ঃ

চট্টগ্রাম নগরের আতুরার ডিপো চামড়ার আড়তে হাটহাজারী উপজেলা থেকে ছয় শ চামড়া নিয়ে এসেছেন দিদার আলম। এসব চামড়া বিক্রির জন্য আড়তদারদের দুয়ারে দুয়ারে ধরনা দিচ্ছিলেন এই মৌসুমি ব্যবসায়ী। কিন্তু এগুলোর কেনার ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ নেই আড়তদারদের। একই অবস্থা দিদার আলমের মতো অন্যান্য মৌসুমি ব্যবসায়ীদেরও। ৩০০-৪০০ টাকা দিয়ে চামড়া সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু এখন ৫০ টাকা দিয়েও তা বিক্রি করতে পারছেন না।

সারা দেশের মতো চট্টগ্রাম নগরেও চামড়ার দামের অস্বাভাবিক দরপতন হয়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এ জন্য আড়তদারদের ‘সিন্ডিকেটকে’ দায়ী করেছেন। তবে চট্টগ্রামের আড়তদারদের অভিযোগ, ঢাকার ট্যানারি ব্যবসায়ীদের কাছে তাঁদের অনেক টাকা বকেয়া। ঈদের এই মৌসুমেও ব্যবসায়ীরা পাওনা টাকা দেননি। ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনতে পারছেন না তাঁরা। আর মৌসুমি ব্যবসায়ীরা আড়তে চামড়া নিয়ে আসতে দেরি করেছেন। ফলে তার গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় চামড়া কিনতে আগ্রহ নেই তাঁদের।

আড়তদারেরা এবার চট্টগ্রামে সাড়ে ৫ লাখ পিস গরুর চামড়া ও ৮০ হাজার পিস ছাগলের চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। তাদের ধারণা, চট্টগ্রামে এবার ৪ লাখ গরু, ১ লাখ ২০ হাজার ছাগল, ১৫ হাজারের মতো মহিষ এবং ১৫ হাজারের মতো ভেড়া কোরবানি দেওয়া হয়েছে।

ঢাকার বাইরে এবার সরকার প্রতি বর্গফুট চামড়ার দর ৩৫ টাকা থেকে ৪০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। বড় গরুর প্রতিটি চামড়া সাধারণত ১৮ থেকে ২০ বর্গফুট হয়। ছোট গরুর চামড়া সর্বোচ্চ ১২ থেকে ১৫ বর্গফুট পর্যন্ত হয়।

ঢাকার ন্যায় চট্টগ্রামেও কাঁচা চামড়ার অস্বাভাবিক দর পতন
ছবিঃ সংগৃহীত

মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৭০ শতাংশ চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান আড়তদাররা। বাকি চামড়া কয়েক দিনের মধ্যে আতুরার ডিপোর আড়তে চলে আসবে বলে তাঁদের ধারণা। কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারীরা জানান, এবার কোরবানির চামড়ার বাজারকে কেন্দ্র করে পাইকারি চামড়া ক্রেতা এবং আড়তদারের প্রতিনিধিরা মিলে সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। তাঁদের লোকজন কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় গিয়ে চামড়া সংগ্রহ শুরু করে। অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক কম দরদাম করায় কোরবানিদাতাদের অনেকেই এতিমখানায় চামড়া দান করেছেন। চামড়ার প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ার কারণে তারা কাঁচা চামড়া এতিমখানায় দিয়েছেন। সিন্ডিকেটের সদস্যরা এতিমখানা থেকে সরাসরি কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছেন।

আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় নগরের আতুরার ডিপো এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের ওপর চামড়া রেখে আড়তদারদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। অনেকক্ষণ তাঁদের দেখা না পেয়ে সরাসরি আড়তে চলে যান তাঁরা। চামড়াগুলো নেওয়ার জন্য আড়তদারদের অনুরোধ করতে থাকেন। কিন্তু তাতে সায় পাননি।

এ সময় কথা হয় ফটিকছড়ি উপজেলার বিবিরহাট থেকে আসা মোহাম্মদ ইউসুফের সঙ্গে। তিনি বলেন, গতকাল সোমবার গ্রামে ঘুরে ঘুরে ১০০টি চামড়া সংগ্রহ করেছেন। প্রতিটি চামড়ার দাম পড়েছে ৩০০ টাকা করে। এসব চামড়া আড়তে আনতে খরচ হয়েছে আরও তিন হাজার টাকা। কিন্তু ১০ টাকা দরেও চামড়াগুলো নিচ্ছেন না আড়তদাররা। যদি বিক্রি করতে না পারেন রাস্তায় ফেলে চলে যাবেন।

আরও পড়ুনঃ সরনকালের দরপতনের মধ্য দিয়ে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ শুরু

২০ জন আড়তদারের কাছে যাওয়ার পর সর্বশেষ মেসার্স ইউনুস চামড়া আড়তদারের কাছে যান মোহাম্মদ ইউসুফ। কিন্তু আড়তদার মোহাম্মদ ইউনুসও রাজি হননি। মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, ট্যানারি ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পান। কিন্তু এরপরও তাঁদের পাওনা টাকা দিচ্ছেন না। হাতে টাকা না থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও চামড়া নিতে পারছেন তাঁরা। ফলে চামড়ার দাম অস্বাভাবিক কমে গেছে। একই কথা বলেন আরেক আড়তদার জাহেদুল আলম।

সড়কদ্বীপে বসেছিলেন মৌসুমি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইলিয়াছ, মোহাম্মদ নাজিম, মনির আহমদসহ ৯ জন মৌসুমি চামড়া সংগ্রহকারী। তাঁদের কেউ ১০০, কেউ ১২০, আবার কেউ ২০০ চামড়া নিয়ে এসেছেন বিক্রি করার জন্য। তাঁরা এসেছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ফটিকছড়ি ও রাউজান উপজেলা থেকে। চামড়ার দাম না পেয়ে খুবই হতাশ তাঁরা। মোহাম্মদ ইলিয়াছ ও মনির আহমদ জানান, একজন আড়তদার প্রতিটি চামড়া ২০ টাকা করে দর দেন। কিন্তু পরে তাঁকে আর খুঁজে পাচ্ছেন না। চামড়াগুলো কিনতে তাঁদের অনেক টাকা খরচ হয়েছে। পরিচিত মানুষের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে গ্রাম থেকে এসব চামড়া কিনেছিলেন। এখন বিক্রি না হওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার হলেন তাঁরা।

ঢাকার ন্যায় চট্টগ্রামেও কাঁচা চামড়ার অস্বাভাবিক দর পতন
ছবিঃ সংগৃহীত

মোহাম্মদ শাহীন নামের মৌসুমি ব্যবসায়ী বলেন, ৭ বছর ধরে চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করে আসছেন তিনি। এই রকম পরিস্থিতি কখনো পড়েননি। আগামীবার থেকে আর এই ব্যবসায় জড়াবেন নিজেকে। এবার শিক্ষা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, চামড়াগুলো তো দেশের সম্পদ। এই ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

তবে চামড়া বিক্রি না হওয়ার জন্য মৌসুমি ব্যবসায়ীদেরও দায় আছে উল্লেখ করে আড়তদার মো. আবদুল জলিল বলেন, চামড়া পচনশীল দ্রব্য। কিন্তু মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বেশি লাভের আশায় চামড়া বিক্রি না করে নিজেদের কাছে রেখে দেন। এখন অনেক চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে। তাই আড়তদাররা জেনে-শুনে তো নষ্ট চামড়া কিনবেন না।

চট্টগ্রামের বৃহত্তর কাঁচা চামড়া আড়তদার সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত তাঁরা প্রায় তিন লাখ চামড়া সংগ্রহ করেছেন। লক্ষ্যমাত্রার বাকি চামড়া এক সপ্তাহের মধ্যে আড়তে চলে আসবে।

চামড়ার দাম না পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুল কাদের বলেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে চট্টগ্রামের আড়তদারেরা প্রায় ৫০ কোটি টাকা পাবেন। শুধু গত বছরের বকেয়া আছে ৩০ কোটি টাকা। এই টাকা না দেওয়ায় সমিতির ১১২ সদস্যের মধ্যে ৮০ শতাংশ সদস্য এবার কাঁচা চামড়া কেনেনি। ট্যানারি মালিকেরা বকেয়া টাকা দিয়ে দিলে আজ এই অবস্থার সৃষ্টি হতো না। মৌসুমি ব্যবসায়ীরাও কষ্ট পেতেন না। স্বাধীনতার পরে আর কখনো এই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here